মীর জাহান এক্টিভিষ্ট ও কলামিষ্ট,ফ্রান্স প্রবাসী ।
মীর জাহান : একটি দীর্ঘ অস্থিরতার পর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করলে জনগণের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি থাকে। এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে মূল তিনটি স্তরে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে,আইনশৃঙ্খলা,রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি জটিল বাস্তবতা: নিজেদের দলের কিছু সুযোগসন্ধানী অংশের অনৈতিক আচরণ। এই প্রেক্ষাপটে সরকার কীভাবে সফল হতে পারে,তা নিয়ে কয়েকটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা যায়।
১. আইনশৃঙ্খলা : শুরুর বার্তাই হবে নির্ধারক সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত “শূন্য সহনশীলতা’’ নীতি ঘোষণা এবং তা বাস্তবে প্রয়োগ করা। বিশেষ করে যদি অভিযোগ ওঠে যে শাসকদলের কিছু নেতা-কর্মী চাঁদাবাজি বা দখলবাজিতে জড়িত,তবে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। দলীয় পরিচয় নয়,অপরাধের ভিত্তিতে ব্যবস্থা,এই বার্তা স্পষ্ট করতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং সেল বা হটলাইন চালু করে জনগণের অভিযোগ সরাসরি গ্রহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।শুরুর কয়েকটি কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপই জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে।
২. দলীয় শৃঙ্খলা: ঘর গোছানোই অগ্রাধিকার অভিজ্ঞতা বলে,সরকার ব্যর্থ হওয়ার বড় কারণ অনেক সময় বিরোধী শক্তি নয়,নিজ দলের ভেতরের বিশৃঙ্খলা। তাই,দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা দ্রুত ও প্রকাশ্যে নিতে হবে । ত্যাগী ও গ্রহণযোগ্য নেতাদের সামনে আনতে হবে। সুযোগসন্ধানীদের প্রভাব কমাতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করা দরকার। সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে,তবে দল যেন সরকারের প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ না করে,এটি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: প্রতিশোধ নয়,পুনর্মিলন অস্থিরতার পর ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধমূলক রাজনীতির পথে হাঁটলে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে। তাই,বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ন্যূনতম সংলাপ ও সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।জাতীয় ইস্যুতে সর্বদলীয় আলোচনার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। রাজনৈতিক মামলাগুলো পর্যালোচনায় একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সরকারের ভাবমূর্তি ইতিবাচক হবে।
৪. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ: দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জনগণের কাছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো বাজারদর। তাই,নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার সংস্থা গুলোকে সক্রিয় করতে হবে। টার্গেটেড ভর্তুকি বা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। এখানে কেবল ঘোষণায় নয়,বাজারে বাস্তব প্রভাব সৃষ্টি করাই হবে মূল বিষয়।
৫. জনসংযোগ ও আস্থা পুনর্গঠন : সরকারের কাজ যত ভালোই হোক,তা যদি মানুষের কাছে পৌঁছায় না,তবে আস্থার সংকট তৈরি হয়। নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং ও তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া টিম থাকতে পারে। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত সফর করলে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়বে।
৬. দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার: টেকসই ভিত্তি তৈরি করে তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেয়ার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও নির্বাচনব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকাংশে কমে আসবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের সফলতা নির্ভর করবে একটি মৌলিক প্রশ্নের উপর,তারা কি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে পারবে? আইনশৃঙ্খলায় কঠোরতা,দলীয় শৃঙ্খলায় দৃঢ়তা,অর্থনীতিতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক আচরণে সহনশীলতা।এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়াতে পারলে সরকার শুধু টিকে থাকবে না,বরং আস্থা অর্জন করতেও সক্ষম হবে। অন্যথায়,নিজেদের ভেতরের দুর্বলতাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। লেখক : মীর জাহান এক্টিভিষ্ট ও কলামিষ্ট,ফ্রান্স প্রবাসী ।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.