প্রকাশিত: ১৬ জুন, ২০২৬ ১১:২৬ (বুধবার)
ইরান চুক্তির ফলে বেকায়দায় নেতানিয়াহু

ছবি : সংগ্রীহিত

 

বার্তা সিলেট ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং শিগগিরই এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে আলাকালে এ কথা বলেন ট্রাম্প। চুক্তির কিছু বিষয় সামনে এনেছেন মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষরের দিন অর্থাৎ শুক্রবার থেকেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া হবে। ওদিকে,ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এ চুক্তি এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি 'রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন' হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের তিনটি মূল স্তম্ভকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তাকে এক নতুন নিরাপত্তা সংকটে ফেলেছে। প্রশ্ন উঠেছে,যিনি নিজেকে ওয়াশিংটনের 'রাজনৈতিক পরামর্শদাতা' হিসেবে তুলে ধরেছিলেন এবং মার্কিন রাজনীতিবিদদের ওপর যার শক্ত প্রভাব ছিল,কীভাবে তাকে পাশ কাটিয়ে তার প্রধান মার্কিন মিত্রইরান চুক্তি করলেন এবং কীভাবে তিনি এভাবে প্রকাশ্যে অপমানিত হলেন? যিনি ইরানকে মোকাবেলার বিষয়টিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখেছিলেন,তিনি কীভাবে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন- যেখানে ইরানই বরং যুদ্ধের আগের চেয়েও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে? তাছাড়া,লেবাননে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের দাবি এখন ইসরায়েলের 'মিস্টার সিকিউরিটি' হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলে দিয়েছে,বিশেষ করে দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে।নেতানিয়াহুর সামনে এখন কোনো ভালো বিকল্প নেই। সোমবার ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে,বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন,সামনে এখন কেবল দুটি পথ খোলা রয়েছে। আমাদের সবচেয়ে বড় মিত্রের সঙ্গে সরাসরি ও মারাত্মক সংঘাত অথবা ইসরায়েলি স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়া।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, রবিবার বৈরুতে হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু কোনো বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেননি। ট্রাম্পের এ বক্তব্য ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং গণমাধ্যম ভাষ্যকাররা লুফে নিয়েছেন। অক্টোবর মাসের আগে হতে যাওয়া নির্বাচন সামনে রেখে বিরোধীরা এখন এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন। নিজের রাজনৈতিক দল লিকুদ পার্টি এবং জোট সরকারের কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের মন্তব্যেও নেতানিয়াহুর ওপর চাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে তেহরানের এ দাবির বিষয়ে যে,যুদ্ধবিরতির আওতায় 'লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান' বন্ধ থাকবে। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন,ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের বাধ্য করে না। আমরা সে চুক্তির অংশীদার নই,যা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা এবং ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলেন,আমেরিকানরা কেন এটি গ্রহণ করল তা বোঝা কঠিন। তিনি বলেন,লেবাননে কী ঘটবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা ইরানকে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে হেজবুল্লাহকে সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার এবং লেবাননের রাজনীতিতে হেজবুল্লাহকে প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। নেতানিয়াহু নিজেও এখন অনেকটা নীরব। নিজেকে প্রায়শই জয়ী হিসেবে দাবি করতে অভ্যস্ত নেতানিয়াহুর এ নীরবতাকে তার কঠিন পরিস্থিতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। গাজায় হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর নেতানিয়াহুর কৌশল ছিল আরও আক্রমণাত্মক হওয়া অর্থাৎ ঝুঁকিগুলোকে আটকে না রেখে সেগুলোকে আগেভাগেই নির্মূল করা। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনী গাজার অনেক এলাকা ধ্বংস করা এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা সত্ত্বেও হামাস এখনো অর্ধেক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নিজেদের শক্তি পুনঃ প্রতিষ্ঠা করছে। অন্যদিকে আট মাস আগের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঝুলে আছে। নেতানিয়াহুর এ নতুন নিরাপত্তা কৌশল ইসরায়েলি বাহিনীকে গাজা,লেবানন ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখলে আটকে ফেলেছে। এটি অনেক ইসরায়েলির কাছে জনপ্রিয় হলেও এর কোনো সুস্পষ্ট কূটনৈতিক সমাধান নেই।

একই সঙ্গে এই দীর্ঘ যুদ্ধ ইসরায়েলের সামরিক সম্পদ ও রিজার্ভ বাহিনীকে চরম ক্লান্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরান ও হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে বারবার সংঘাতে জড়ানো সত্ত্বেও নিজের প্রধান শত্রুদের এখনও নির্মূল করতে পারেনি ইসরায়েল। বরং তেহরানকে আরও বেশি কট্টরপন্থী নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছে,যারা মার্কিন-ইসরায়েলি শক্তির ভয় থেকে মুক্ত এবং হরমুজ প্রণালিতে তাদের প্রভাব আরও বেড়েছে। এছাড়া ইসরায়েলের প্রধান শত্রু নিজেই ইসরায়েলের মূল মিত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে বলেও এখন দেখা যাচ্ছে। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ এর সিনিয়র ইরান গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন,"ইসরায়েলের এই ব্যর্থতা তেহরান বিষয়ক কৌশল পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। তাদের আরও বাস্তবসম্মত ও সংযত অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। তিনি আরও বলেন,ওয়াশিংটন যদি মনে করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ চুক্তিটি ভেস্তে দেওয়ার প্রচেষ্টা,তবে তার কঠোর প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ওবামা প্রশাসনের সময় নেতানিয়াহু যেভাবে হোয়াইট হাউসকে এড়িয়ে কংগ্রেস ও মার্কিন জনমতের মাধ্যমে নিজের কাজ হাসিল করার চেষ্টা করতেন,বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ প্রায় নেই,বলেও মনে করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরেই নেতানিয়াহুর দাবি ছিল যে,তার রাজনৈতিক দক্ষতা ও নীতি আঞ্চলিক হুমকি থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করার সেরা উপায়। ইরানের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয়তো নিতানিয়াহুর এই রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও নির্বাচনী বয়ানকে রক্ষা করতে পারত। কিন্তু এর পরিবর্তে,তার নতুন নিরাপত্তা নীতি তাকে কোনো শত্রুর সঙ্গে নয়,বরং এক মিত্রের সঙ্গেই সংঘাত অথবা আত্মসমর্পণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সূত্র : বিবিসি