বাংলাদেশ

বগুড়া-৬ এবং শেরপুর-৩ এর উপনির্বাচন,আরেকটু গ্রহণযোগ্য করা যেতোনা ?

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ০১:২৮

মীর জাহান,প্রধান সম্পাদক বার্তা সিলেট।

 

মীরজাহান : বগুড়া-৬ এবং শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে যে চিত্র সামনে এসেছে,তা মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে,যেখানে ভোটাররা নির্বিঘ্নে তাদের মত প্রকাশ করবে,প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা সমান সুযোগ পাবে,আর নির্বাচন কমিশন থাকবে নিরপেক্ষ। কিন্তু বাস্তবে তা বরং পুরনো আশঙ্কাকেই জাগিয়ে তুলেছে।নির্বাচন মানেই কি নিয়ন্ত্রিত ফলাফল ? সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যে অনিয়ম ও অভিযোগ উঠেছে,সেগুলো একেবারেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। ভোটকেন্দ্রে বাধা, প্রতিপক্ষ প্রার্থীর কর্মী/সমর্থকদের ওপর চাপ,প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের অভিযোগ নতুন কিছু না।কিন্তু উদ্বেগজনক হলো,সরকার পরিবর্তনের পরও একই ধরনের চিত্রের পুনরাবৃত্তি। প্রশ্নটা তাই আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। বিএনপি সরকার কি সত্যিই পারত না এই নির্বাচনটাকে অন্তত একটি গ্রহণযোগ্যতার মানে নিয়ে যেতে ? একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার,সুষ্ঠু নির্বাচন মানেই যে বিরোধী দল জিতবে,এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলই জেতে এবং সেটাই স্বাভাবিক। যদি তাদের জনপ্রিয়তা থাকে। কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠু হলে কমপক্ষে ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন থাকে না,পরাজিত পক্ষও সেটা সহজে মেনে নিতে পারে। বগুড়া-৬ এবং শেরপুর-৩ এর উপ-নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে,যেখানে ফলাফল ঘোষণার আগেই মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকে গেছে যে, জনগণের মতামতের প্রতিফলন নাকি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল ফলাফল ?

আপনি যদি নিশ্চিত থাকেন যে,আপনার প্রার্থীই জিতবে,তাহলে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রয়োজনটা কোথায়? বরং একটি স্বচ্ছ,নিরপেক্ষ নির্বাচন আপনাকে আরও শক্তিশালী বৈধতা দিত। আন্তর্জাতিক মহলেও একটি ইতিবাচক বার্তা যেত যে,এই সরকার অন্তত নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সম্মান করে। কিন্তু তার বদলে কেন এমন একটা পথ বেছে নেওয়া হলো,যেখানে শুরুতেই “অনিয়ম” আর “কারচুপি” শব্দগুলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায়? আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই সরকার যদি ছোট পরিসরের উপনির্বাচনই বিতর্ক মুক্তভাবে করতে না পারে,তাহলে ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বা আরও বড় কোনো নির্বাচনে মানুষ কীভাবে আস্থা রাখবে? জনগণের আস্থা একবার নষ্ট হয়ে গেলে সেটি পুনর্গঠন খুবই কঠিন। এখন মানুষ শুধু ফলাফল দেখে না, প্রক্রিয়াটাও দেখে। তারা জানতে চায়,আমি যদি ভোট দিতে যাই,আমার ভোটটা কি সত্যিই গণনা হবে? গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে বিশ্বাস।ভোটারদের বিশ্বাস যে তাদের ভোটের মূল্য আছে। সেই বিশ্বাসে যদি ফাটল ধরে,তাহলে পুরো ব্যবস্থাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আর সেই জায়গাতেই এই উপনির্বাচনগুলো বড় একটি ধাক্কা দিয়েছে। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো,এই পরিস্থিতি এড়ানো একেবারেই অসম্ভব ছিল না। একটু সদিচ্ছা, প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ,নির্বাচন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা,এই তিনটি জিনিস থাকলেই নির্বাচনের আয়োজন গ্রহণযোগ্য করা যেত। তাতে হয়তো ভোটের ব্যবধান কিছুটা কম হতো,প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও দৃশ্যমান হতো। আর এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়,ক্ষমতায় থেকেও যদি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতায় প্রশ্ন উঠে,তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজনটাই বা কোথায়? আর যদি প্রমাণ করতেই হয়,তাহলে কেন সেই সুযোগটা বারবার নষ্ট করা হচ্ছে? জনগণ শুধু ফলাফল না,প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতা দেখতে চায়। এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা,পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করে। 

মীর জাহান : প্রধান সম্পাদক বার্তা সিলেট,অনলাইন এক্টিভিষ্ট, ফ্রান্স প্রবাসী

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন