বাংলাদেশ

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চালের ডিলারশিপ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ০২:০২

ছবি : সংগ্রীহিত

 

বার্তা সিলেট ডেস্ক : খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন নিয়মে প্রতি ২৫০ জন উপকারভোগীর বিপরীতে একজন করে ডিলার নিয়োগ দেয়া হবে। আগে প্রতি ৫০০ জন উপকারভোগীর বিপরীতে একজন ডিলার নিয়োগের বিধান ছিল। ডিলারের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি উপকারভোগী নির্বাচন,চালের মান ও বিতরণ,ডিলার নিয়োগ ও তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি নীতিমালা-২০২৪ (সংশোধিত)’ পর্যালোচনায় এসব পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি জারি করা সংশোধিত নীতিমালায় উপকারভোগীদের তালিকা হালনাগাদ,একই পরিবারের একাধিক সরকারি সুবিধা গ্রহণ বন্ধ, খাদ্যশস্য আত্মসাতে কঠোর শাস্তি এবং ডিলারদের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

বাড়ছে ডিলারের সংখ্যা : খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে ডিলার সংখ্যা বাড়ানো সংশোধিত নীতিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। আগে প্রতি ৫০০ জন উপকারভোগীর বিপরীতে একজন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলেও এখন প্রতি ২৫০ জনের বিপরীতে একজন ডিলার নিয়োগ দেয়া হবে।

নীতিমালার এ পরিবর্তনের ফলে নির্ধারিত সংখ্যক উপকারভোগীর জন্য বিতরণকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়বে। এতে বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষের চাল সংগ্রহের দূরত্ব কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা এবং চাল বিতরণকেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড়ের সমস্যাও কমতে পারে। তবে নতুন নিয়মে একটি ওয়ার্ডে একের অধিক ডিলার নিয়োগ দেওয়া যাবে না। ফলে ডিলার সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ওয়ার্ডভিত্তিক উপকারভোগীর সংখ্যা ও বিতরণকেন্দ্র নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) আমাদের সময়কে বলেন,খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো প্রকৃত দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের কাছে সরকারের সহায়তা সহজে পৌঁছে দেয়া। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই ডিলার নিয়োগ ও চাল বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতি ২৫০ জন উপকারভোগীর বিপরীতে একজন ডিলার নিয়োগের ফলে সাধারণ মানুষের চাল সংগ্রহ আরও সহজ হবে। বিশেষ করে নারী,বয়স্ক ও অসহায় মানুষ যাতে সহজে তাদের বরাদ্দের চাল সংগ্রহ করতে পারেন,সে বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, এ কর্মসূচির সুফল যেন কোনোভাবেই অপাত্রে না যায়, সে জন্য বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

পাঁচ বছর পর বদলাবে উপকারভোগী : সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী,একজন নির্বাচিত উপকারভোগী অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এ সুবিধা পাবেন। তবে পাঁচ বছর পরও কোনো পরিবারের দারিদ্র্য না কমলে বা ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি না পেলে তাকে পুনরায় তালিকাভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এ বিধানের উদ্দেশ্য হলো, দীর্ঘদিন ধরে একই পরিবার সুবিধা পাওয়ার পরিবর্তে নতুন যোগ্য ও দরিদ্র পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনা। তবে পাঁচ বছর পর কোনো পরিবারের যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হবে এবং পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হবে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

চাল আত্মসাতে দ্বিগুণ জরিমানা : খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল আত্মসাৎ, কালোবাজারে বিক্রি কিংবা মজুদের হিসাবে অননুমোদিত ঘাটতি পাওয়া গেলে ডিলারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে সংশোধিত নীতিমালায়। এক্ষেত্রে খাদ্যশস্যের আর্থিক মূল্যের দ্বিগুণ হারে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ সরকারি খাতে আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ডিলারশিপ বাতিল এবং ফৌজদারি মামলার ব্যবস্থাও রয়েছে। অন্যদিকে,উপকারভোগীদের জন্য বরাদ্দ করা চাল সংগ্রহের পর তা ডিলারের কাছে বা অন্য কোথাও বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কার্ড স্থগিত বা বাতিল করার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ,শুধু ডিলার নয়,কর্মসূচির সুবিধার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

হালনাগাদ করতে হবে তালিকা : উপকারভোগী নির্বাচন ও তালিকা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালা জারির চার মাসের মধ্যে বিদ্যমান ইউনিয়নভিত্তিক তালিকা যাচাই করে হালনাগাদ করতে হবে। প্রতিবছর জুন ও জুলাই মাসে উপকারভোগীদের তালিকা হালনাগাদ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে নতুন যোগ্য পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

একই সঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভিডব্লিউবি কর্মসূচি এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগীদের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে সুবিধা নেওয়া হলে কার্ড বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে।

ডিলার নিয়োগে বাড়ছে আর্থিক শর্ত : সংশোধিত নীতিমালায় ডিলার নিয়োগে আর্থিক সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত শর্ত কঠোর করা হয়েছে। নির্বাচিত ডিলারকে নিয়োগপত্র পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ৫০ হাজার টাকা জামানত দিতে হবে। আবেদনের সময় এক হাজার টাকা ফি ও তিন হাজার টাকা ফেরতযোগ্য আর্নেস্টমানি জমা দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকে ন্যূনতম এক লাখ টাকার সচ্ছলতার সনদ এবং পাঁচ টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। ডিলারশিপের মেয়াদ দুই বছর। প্রতিবছর এক হাজার টাকা ফি দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। বিলম্বে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে অতিরিক্ত জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।

ডিলার হওয়ার অযোগ্যতা : ডিলার নিয়োগে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ডিলার হওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। এ ছাড়া ডিলারশিপ সরাসরি অন্য কারও কাছে হস্তান্তর বা সাবলেট দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ডিলারের মৃত্যু হলে উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিধান প্রযোজ্য হবে।

সপ্তাহে তিন দিন চাল বিক্রি বাধ্যতামূলক : নিয়মিত চাল বিতরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনার সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছে। সপ্তাহের রবি থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে স্থানীয় কমিটির নির্ধারিত যে কোনো তিন দিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত বিক্রয়কেন্দ্র খোলা রাখতে হবে। খাদ্যশস্য উত্তোলনের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের অংশগ্রহণ বন্ধের বিধানও রয়েছে। ডিলার নিজে অথবা ছবি প্রত্যয়নকৃত প্রতিনিধির মাধ্যমে খাদ্যশস্য উত্তোলন করতে পারবেন। খাদ্যশস্য উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও ট্যাগ অফিসারকে এসএমএসের মাধ্যমে অবহিত করতে হবে।

সাধারণ চালের পাশাপাশি পুষ্টিচাল : খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে পুষ্টিমান বাড়ানোর বিষয়টিও সংশোধিত নীতিমালায় গুরুত্ব পেয়েছে। সরকার নির্ধারিত এলাকায় সাধারণ চালের পরিবর্তে অথবা তার পাশাপাশি ছয় ধরনের মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসমৃদ্ধ পুষ্টিচাল বিতরণের বিধান রাখা হয়েছে। এ চালের সঙ্গে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি১, ভিটামিন বি১২, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ও জিংকের মতো পুষ্টি উপাদান যুক্ত থাকবে। তবে পুষ্টিচালের মান নিশ্চিত করতে বিশেষ পরীক্ষাগার ও গবেষণার বিধান রয়েছে। নিম্নমানের, দূষিত বা মেয়াদোত্তীর্ণ পুষ্টিচাল বিতরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতা ও উপকারভোগী ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ডিলার নিয়োগ,চাল বিতরণ,আর্থিক শর্ত এবং অনিয়মের শাস্তি-বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব বিধানের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে সরকারি খাদ্যশস্য বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে। তবে নতুন নিয়মের সুফল কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে তালিকা যাচাই, ডিলার নিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ে তদারকির ওপর। সূত্র : আমাদের সময়

 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন